চেক ডিজঅনার বা চেক প্রত্যাখ্যান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি বহুল পরিচিত অথচ জটিল আইনি সমস্যা। অনেকেই জানেন না, চেক বাউন্স হলে কী পদক্ষেপ নিতে হয়, কতোবার চেক ডিসঅনার করানো যায়, কখন মামলা করা যায় কিংবা কিভাবে আইনগত নোটিশ পাঠাতে হয়। ভুল তথ্য ও পরামর্শের কারণে অনেকেই সঠিক সময়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হন, যার ফলে তারা আইনি ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।
এই পৃষ্ঠাটি নবীন আইনজীবী এবং ন্যায়বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু কার্যকর গাইড হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। এখানে চেক ডিজঅনার, তার জন্য লিগ্যাল নোটিশ প্রেরণ, চেক সংকান্ত ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিকার সংক্রান্ত সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নগুলোর (সজিপ্র) সহজ ও স্পষ্ট উত্তর দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্নগুলোর উত্তর পাবেন কোথায়?
প্রত্যেক মানুষের সমস্যা ভিন্ন, তাই প্রশ্নও ভিন্ন হতে পারে। এই পাতার প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রতিটি প্রশ্নের মধ্যে আড়াল করা হয়েছে, যাতে ব্যবহারকারীরা সহজেই তাদের কাঙ্খিত প্রশ্নটি খুঁজে পেতে পারেন। প্রশ্নের উত্তর পেতে আপনার কাঙ্খিত প্রশ্নের উপর চাপ দিন, সঙ্গে সঙ্গে উত্তরটি বেরিয়ে আসবে। যদি আপনি উত্তরটি আড়াল করতে চান, পুনরায় প্রশ্নের উপর চাপ দিন। মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রশ্নের উপর চাপ দিয়ে ধরে না রেখে সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিন। এই সহজ পদ্ধতিতে আপনি আপনার কাঙ্খিত প্রশ্নের উত্তর দ্রুত খুঁজে পেতে পারেন।
একবার ডিসঅনার হলেই মামলা করা যায়। বারবার ডিসঅনার করানোর প্রয়োজন নেই।
১. চেক ডিজঅনার হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে লিগ্যাল নোটিশ পাঠাতে হবে।
২. নোটিশে চেকের টাকা পরিশোধ করে চেকটি ফেরতে নেয়ার জন্য ৩০ দিনের সময় দিতে হবে।
৩. চেকদাতা চেকের টাকা পরিশোধ না করলে, নোটিশ পাঠানোর ৩০ দিন পার হবার পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে মামলা করতে হবে।
✅ নোটিশ পাঠানোর ৬০ দিনের মধ্যে মামলা করতে হয়।
জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে চেক ডিজঅনারের মামলা করতে হয়। মহানগর এলাকা তথা সিটি কর্পোরেশনভুক্ত থানার ক্ষেত্রে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত এবং নহানগর নয় এমন এলাকার ক্ষেত্রে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) আদালতে এই মামলা দায়ের করতে হয়।
✅ প্রত্যেক থানাকে একটি আঞ্চলিক এখতিয়ার ধরে আদালতের এখতিয়ার নির্ধারণ করা থাকে। কোন থানা কোন আদালতের এখতিয়ারে থাকবে সেটা সময়ে সময়ে নির্ধারণ করা হয়।
সাধারণত যে ব্যাংকের যে শাখায় চেক ডিজঅনার হয়েছে সেটি যে থানায় অবস্থিত সে থানার এখতিয়ারাধীন আদালতে চেকের মামলা করা হয়। তবে সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ের আলোকে নিম্নোক্ত স্থানসমূহে মামলা করা যায়–
০ যে থানার আওতায় চেকটিতে সই করা হয়েছে;
০ যেখানে চেকটি হস্তান্তর করা হয়েছে;
০ যেখানে চেকটি ডিজঅনার হয়েছে;
০ যেখান থেকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে;
০ যেখানে বাদী বা পাওনাদার বসবাস করেন।
১. চেকের ফটোকপি ও মূল চেক;
২. ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত চেক ডিজঅনার মেমো;
৩. লিগ্যাল নোটিশের কপি;
৪. (ক) ডাক রসিদ, এবং
(খ) এ/ডি (যদি ফেরত আসে);
৫. বাদীর মূল জাতীয় পরিচয়পত্র ও ফটোকপি;
৬. প্রতিনিধির মাধ্যমে মামলা করালে কোম্পানির ক্ষেত্রে ক্ষমতাপত্র এবং ব্যক্তির ক্ষেত্রে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি;
৭. মামলার আরজি;
৮. দশ টাকার প্রসেস ফি;
৯. তিনশত টাকা নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের হলফনামা (নোটারি করাতে হবে না);
১০. আরজি ব্যতীত অন্যান্য কাগজপত্র ফিরিস্ত ফরম পূরণ করে আদালতে জমা দিতে হবে।
মামলার খরচ নির্ভর করে কোর্ট ফি, স্ট্যাম্প, কাগজপত্র এবং আইনজীবীর ফি’র উপর। নিম্নে একটি আনুমানিক হিসাব দেয়া হলো
১. হাজিরা কাগজ/কার্টিজ পেপার: ৫০-১০০ টাকা;
২. ওকালতনামা: ২০০-৫০০ টাকা (জেলা ভেদে বিভিন্ন);
৩. কোর্ট ফি: ৫০-১০০ টাকা;
৪. হলফনামার স্ট্যাম্প: ৩০০ টাকা এবং ভেন্ডর ফি;
৫. অন্যান্য খরচ: ৫০০–১০০০ টাকা;
৬. আইনজীবীর ফি: অবস্থান ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভিন্ন হয়। এটি ৫,০০০ থেকে শুরু করে ২০,০০০ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।
✅ মামলা করার সময় শুরুতেই মোটামুটি খরচ: ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা।
আইন অনুযায়ী একবার চেক ডিজঅনার হলেই মামলা করা যায়। Negotiable Instruments Act, 1881-এর ধারা ১৩৮-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, একটি চেক একবার ডিজঅনার (বাউন্স) হওয়ার পর নির্ধারিত আইনি পদক্ষেপ নিলে মামলা করা যাবে।
এটি একটি ভুল ধারণা বা আদালতের বাইরের পরামর্শদাতাদের তৈরি বিভ্রান্তি। কেউ কেউ হয়তো চেকদাতাকে বারবার সুযোগ দিয়ে একাধিকবার চেক জমা দেন, ভাবেন তাতে মামলার শক্তি বাড়ে—কিন্তু আসলে এতে সময় নষ্ট হয় এবং মামলা করার আইনি সময়সীমা পার হয়ে যেতে পারে।
১. চেক একবার জমা দিন;
২. বাউন্স হলে ব্যাংকের ‘ডিজঅনার মেমো’ সংগ্রহ করুন;
৩. ৩০ দিনের মধ্যে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান;
৪. ৩০ দিন অপেক্ষা করুন;
৫. টাকা না পেলে, পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে মামলা করুন।
না, একাধিকবার চেক ডিজঅনার করাতে আইনগত কোনো বাধা নেই। ডিজঅনার হওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো না হলে মামলা করা যায় না। এই ক্ষেত্রে, চেকটি আবার ব্যাংকে উপস্থাপন করে ডিজঅনার করানো হলে, নতুনভাবে ৩০ দিন সময় গণনা শুরু হয়।
সর্বশেষ চেক ডিজঅনার হওয়ার দিন থেকে ৩০ দিনের মধ্যে লিখিত লিগ্যাল নোটিশ পাঠাতে হবে।
“নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১” এর ১৩৮ ধারা অনুযায়ী শুধুমাত্র একবারই লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো যাবে। একবার লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে দিলে তখন থেকেই অর্থ পরিশোধের জন্য ৩০ দিনের সময় গণনা শুরু হয়। এই ৩০ দিন শেষ হওয়ার পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে মামলা দায়ের করতে না পারলে, এনআই অ্যাক্টের আওতায় আর মামলা করা যায় না।
হ্যাঁ, একাধিকবার লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। ধারা ১৩৮ অনুযায়ী, চেক ডিজঅনার হওয়ার পর একবারই বৈধ লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো যায়।
Ahsan Habib Chowdhury vs. Multidrive Ltd. [14 BLC (2009) 66] মামলায় হাই কোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, “…law permits presenting of the cheque for as many times as the complainant desires, but the notice should be served only once as per law. Repeated notices cannot be served as subsequent issuance of notice are nothing but a clever deceive to overcome the limitation prescribed under clauses 1(b) and (c) of section 138.”
অর্থাৎ, হাই কোর্টের রায় অনুযায়ী, ১৩৮ ধারার আওতায় চেক যতবার ইচ্ছা ব্যাংকে উপস্থাপন করা যায়, কিন্তু লিগ্যাল নোটিশ একবারের বেশি দেওয়া আইনত অনুমোদিত নয়। একাধিক নোটিশ পাঠালে তা সময়সীমা এড়ানোর কৌশল বলে মনে করা হয়, যা আদালত গ্রহণযোগ্য নাও মনে করতে পারেন।
আইনজীবীর অবস্থান, প্রভাব ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন খরচ হয়। সাধারণ পর্যায়ের আইনজীবী সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত ফি নেন, সর্বনিম্ন খরচ মক্কেলের সঙ্গে আইনজীবীর সম্পর্ক ও আলোচনা সাপেক্ষ বিষয়।
একবার লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হলে, সেই নোটিশের পর ৩০ দিনের মধ্যে টাকা না পেলে, পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে মামলা করতে হয়। নোটিশ পাঠানোর পর মোট সময় ৬০ দিন। ৬০ দিন পেরিয়ে গেলে এনআই অ্যাক্টের অধীনে চেক ডিজঅনারের মামলা করা যাবে না।
এ/ডি ফেরত না এলেও আপনি মামলা করতে পারবেন, যদি প্রমাণ করতে পারেন যে, নোটিশ সঠিক ঠিকানায় রেজিস্ট্রিভুক্ত ডাকে পাঠানো হয়েছে, এবং তার রসিদ আপনার কাছে রয়েছে।
‘Service by dispatch’-এর নীতিতে ধরে নেওয়া হয়, যথাযথভাবে পাঠানো হলে তা গৃহীত হয়েছে। এক্ষেত্রে জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২৭ ধারা প্রযোজ্য হবে।
আপনি একই চেকের ভিত্তিতে দ্বিতীয়বার নতুন লিগ্যাল নোটিশ পাঠাতে পারবেন না, যদিও চেকের মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি।
Ahsan Habib Chowdhury vs. Multidrive Ltd. [14 BLC (2009) 66] মামলায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “Repeated notices cannot be served as subsequent issuance of notice are nothing but a clever deceive to overcome the limitation prescribed under clauses (b) and (c) of section 138 of the Act.”
অর্থাৎ, একবার লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর পর সময়সীমা পার হয়ে গেলে নতুন নোটিশ দিয়ে মামলা চালানো যাবে না, এমনকি চেকের মেয়াদ থাকলেও না। পুনরায় চেক ডিসঅনার করানো যাবে, কিন্তু নতুন করে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো ও মামলা করা যাবে না, কারণ একবার আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে ধরা হয়।
⚠️ সতর্কতা: অনেকে মনে করেন যে চেকের মেয়াদ থাকলে যতবার খুশি ডিসঅনার করিয়ে নতুন নোটিশ পাঠানো যায় — এই ধারণা ভুল এবং আদালত তা অনুমোদন করেন না। একাধিকবার নোটিশ পাঠালে আদালত মামলাটি খারিজ করে দিতে পারে।
এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারা অনুযায়ী, চেক ডিজঅনারের পর একবারই লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো যাবে। প্রথমবার নোটিশ পাঠানোর তারিখ থেকেই আইন অনুযায়ী সময় গণনা শুরু হবে। দ্বিতীয়বার নোটিশ পাঠিয়ে মামলা করা হলে মামলাটি খারিজ হবে।
তবে, যদি আপনি প্রথমবার নোটিশ পাঠানোর বিষয়টি আদালতে প্রমাণ করতে না পারেন, তাহলে মামলাটি খারিজ হবে না।
অর্থাৎ, একবার লিগ্যাল নোটিশ পাঠানোর পর সেটি সার্ভ না হয়ে ফেরত আসলে এবং প্রথমবার নোটিশ পাঠানোর বিষয়টি আসামীর কাছে যথাযথ প্রমাণ না থাকলে, বাদী সেই সুযোগ গ্রহণ করতে পারে, যদিও তা আইনসম্মত নয়।
১. আপনি “পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি” দিয়ে একজন প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারেন, যিনি আপনার পক্ষে আদালতে যাবেন।
২. ফৌজদারি কার্যবিধির ২০৫ বা ৫৪০ক ধারায় ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতির আবেদন করতে পারেন। আদালত মঞ্জুর করলে, আপনার আইনজীবীই আপনার পক্ষে হাজিরা দেবেন।
১. চেকটির তারিখ যদি এখনো ৬ মাসের মধ্যে হয় বা তারিখ উল্লেখ না থাকে, তাহলে আপনি তা ব্যাংকে জমা দিয়ে ডিজঅনার করাতে পারেন এবং এনআই অ্যাক্টের অধীনে ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
২. যদি ৬ মাস পেরিয়ে যায়, তাহলে
(ক) দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০ ধারায় ফৌজদারি মামলা করতে পারেন, কারণ এটি প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে প্রযোজ্য; অথবা,
(খ) দেওয়ানি আদালতে পাওনা টাকা আদায়ের মামলা করতে পারেন।
✅ চেকের অবস্থা ও প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াই বাঞ্ছনীয়।
এটি পরিস্থিতিনির্ভর। ৪০৬/৪২০ ধারায় ফৌজদারি মামলা প্রধানত আসামীর শাস্তি দেয়ার জন্য হয়ে থাকে। শুধুমাত্র ফৌজদারি মামলা করলেই টাকা ফেরত মিলবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। অনেক সময় আসামি সাজা এড়াতে আপোষ করে টাকা পরিশোধ করেন।
চেকদাতা যদি টাকা ফেরত না দেন, তাহলে আলাদাভাবে দেওয়ানি আদালতে টাকা আদায়ের মামলা করতে হবে।
৪০৬/৪২০ ধারার মামলায় শাস্তি পাওয়ার পরও যদি চেকদাতা টাকা ফেরত না দেয়, তবে আপনি আলাদাভাবে দেওয়ানি আদালতে মামলা করে টাকা ফেরত পেতে পারেন।
মিফতাহুর রহমান, অ্যাডভোকেট, ঢাকা জজ কোর্ট
Discover more from কৌঁসুলির কলাকৌশল
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

চমৎকার উপস্থাপনা।👌